কষ্ট বুকে চেপে রাজধানী ছাড়ছেন স্মার্ট ঝালমুড়ি ওয়ালা

‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, জুলহাস কেন পিছিয়ে থাকবে? প্রথমে লুঙ্গি পড়ে ঝাল মুড়ি বিক্রি করতাম। এখন পরিষ্কার ও স্মার্ট কাপড় পড়ে ঝাল মুড়ি বিক্রি করি।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের মতো আধুনিক বানাতে চায়। আমার কাছেও যারা ঝালমুড়ি খায়, তারা মনে করে সিঙ্গাপুর বসে খাচ্ছে।’ এভাবে নিজের পরিচয় দেয়া সেই আলোচিত স্মার্ট ঝালমুড়ি বিক্রেতা জুলহাস হাওলাদার এবার চিরতরে রাজধানী ছেড়ে গেলেন।

বৃহস্পতিবার (২৫ মার্চ) ভোর রাত ৪টার দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পিছন থেকে একটি মিনি মালবাহী ট্রাকে করে তিন সন্তান ও স্ত্রীসহ ঢাকায় তার সমস্ত আসবাবপত্র নিয়ে শরীয়তপুরের পথে রওনা দেন জুলহাস। শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ট্রাকটি তাদের নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়।

এসময় মুঠোফোনে সোনালীনিউজকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলের চিকিৎসা ও সংসারের হাল টানতে না পেরে রাজধানী ছাড়ার কথা জানান জুলহাস।

তিনি বলেন, ‘একবুক স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীতে এসেছিলাম। কিন্তু ছেলেটা অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে খুবই অসুবিধায় পড়ে গেছি। আর ঢাকায় যে কয় টাকা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালাতে পারছিলাম না। আমার ছেলেটাকে মনে হয় বাঁচাতে পারবো না। সবাই আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করবেন।’

এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি “একবুক ‘কষ্ট’ নিয়ে রাজধানী ছাড়ছেন স্মার্ট ঝালমুড়ি ওয়ালা” শিরোনামে প্রকাশিত সোনালীনিউজের এক প্রতিবেদনে ব্যাপক সমালোচিত হয় এ স্মার্ট ঝালমুড়ি ওয়ালা।

রাজধানীর শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ফুটপাতে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন জুলহাস। তার মুড়ি রাখার বস্তায় একপাশে থাকতো ফুলের মালা দিয়ে সাজানো বঙ্গবন্ধুর বাঁধাই করা একখানা ছবি আর অন্য পাশে তার বাবার মুক্তিযোদ্ধার সনদের বাঁধাই করা ফটোকপি।

চোখে চশমা, কানে এয়ারফোন, চকচকে শার্ট, গলায় টাই, পায়ে কালো সু, পকেটে মোবাইল ও কলম এবং হাতে সিলভার রংয়ের ঘড়ি পরেন জুলহাস। ৪৫ বছর বয়সের এই ব্যক্তি সর্বদা এমন পরিপাটি সাজে ঝালমুড়ি বিক্রি করে রীতিমত ভাইরাল।

১৯৭৫ সালের ১মে শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার ধানকাটি গ্রামে জন্ম জুলহাসের। তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পেছনে ছোট একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি।

তার পিতা মো. তছলিম হাওলাদার একজন মুক্তযোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধে বাংলাদেশ জয়ের পর এদেশীয় রাজাকারদের হাতে তার পিতার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি জুলহাসের।

জুলহাস জানান, ‘বাবা যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যায় তখন দাদাকে এদেশীয় রাজাকাররা কুকুরের ভ্যাকসিন দিয়ে মেরে ফেলে। পরবর্তীতে দেশ জয়ের পর বাবা যখন ফিরে আসে তখন অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গ নিয়ে ওইসব রাজাকারদের মেরে ফেলা হয়। সেই রাজাকারদের বংশের লোকরাই পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফখরুদ্দিন আহমেদের সময়ে আমার বাবা ও বড় ভাইকে হত্যা করে।’

তিনি জানান, ‘আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সময় ঘরে দু’মুঠো চাল ও ডাল পর্যন্ত রেখে যেতে পারেননি। যুদ্ধের চার বছর পর আমার জন্ম হয়েছে।

মানুষের বাসা থেকে ভাতের মাড়, জুটা খাবার কুড়িয়ে খেয়েছি। অভাবের কারণে লেখাপড়া করতে পারিনি। বাসা বাড়িতে কাজ করেছি, বিভিন্ন পেশার পর এখন স্মার্ট হয়ে ঝালমুড়ি বিক্রি করছি।’

পূর্বে গণমাধ্যমের নিউজ ও বিভিন্ন ইউটিউবারদের ভিডিওতে জুলহাস প্রধানমন্ত্রীকে নিজ হাতে ঝালমুড়ি বানিয়ে খাওয়ানোর সখের কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ঝালমুড়ি বানিয়ে খাওয়ানোর সখ পূরণ হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জুলহাস বলেন, ‘না, এখনও আমি প্রধানমন্ত্রীকে নিজ হাতে ঝালমুড়ি বানিয়ে খাওয়াতে পরিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাছ থেকে দুটো কথা বলতে পারলে আর তাকে আমার হাতে ঝালমুড়ি বানিয়ে খাওয়াতে পারলে আমি সবথেকে বেশি শান্তি পাবো। আমার বিশ্বাস একদিন আমি এ সখ নিশ্চয়ই পূরণ করতে পারবো। জননেত্রী ভিক্ষুকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ভ্যানচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন, আমার সঙ্গেও তিনি কথা বলবেন।’

বিশ্ব এখন করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কলঙ্কিত। বাংলাদেশও এই পরিস্থিতির বাহিরে নয়। আগে পরিপাটি পোশাকে স্মার্ট এ ঝালমুড়ি বিক্রেতা জুলহাসকে ঘিরেই উৎসুক মানুষের ভিড় লেগে থাকতো। করোনার কারণে এখন সেই ভিড় নেই। এ সময়ে ব্যবসা কেমন যাচ্ছে জানতে চাইলে জুলহাস বলেন, ‘করোনায় ঝালমুড়ি আগের মতো এখন আর মানুষ খায় না।

তাই বেচা-বিক্রি কম হওয়ায় রাজধানীতে টিকে থাকাটা এখন আমার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাছাড়া, আমার তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলেটার একটা কঠিন রোগ হয়েছে। যার চিকিৎসা এদেশে নেই। ওকে একটু ভালো খাবার খাওয়াবো তাও প্রতিদিন ব্যবস্থা করতে পারি না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামি দু’এক মাসে রাজধানী ছেড়ে চিরতরে গ্রামে চলে যাবো।’

গ্রামে গিয়ে স্মার্টভাবে ঝালমুড়ি বিক্রি করবেন কী, সেখানে কী রাজধানীর থেকে বেশি আয় করতে পারবেন জানতে চাইলে জুলহাস বলেন, ‘এতদিন গ্রামে ঘর ছিলো না। মা কিস্তিতে টাকা এনে আমার জন্য একটি ঘর তুলেছেন। আমি আমার পরিবার নিয়ে সেই ঘরে গিয়ে থাকবো। ঢাকায় বাসা ভাড়া দিতে হয়, শাক-সবজি থেকে শুরু করে সব কিছু কিনতে হয়। কিন্তু গ্রামে থাকলে আমি শাক-সবজী চাষ করতে পারবো। মাছ ধরতে পারবো। আর যে কাজ পাবো সেই কাজ করবো। সুযোগ হলে গ্রামে গিয়ে ঝালমুড়ি বিক্রি করবো।’

জুলহাসের অসুস্থ ছেলে (ছবি: সোনালীনিউজ)
সরকার গৃহহীনদের ঘর দিচ্ছে, পুঁজিহীনদের ব্যবসা করতে ঋণ দিচ্ছে এসবের কিছু পেতে আগ্রহী কীনা জানতে চাইলে জুলহাস জানান, ‘আমি সরকারের কাছ থেকে দানের কিছু চাই না। আমি ভালোভাবে ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু ব্যবসা করার পুঁজি আমার নেই। সরকার যদি আমাকে ব্যবসা করার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে দেয় তবে আমি ৫০টি ছাগল ও ১০০টি মুরগী পালবো। টাকা পেলে আমি এই ধরনের ব্যবসা করতে চাই। আমি সরকারের থেকে দান চাই না, ঋণ চাই।’

জুলহাসের বড় ছেলের কী ধরনের রোগ হয়েছে এবং চিকিৎসার জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে স্ত্রী সুমা বেগম জানান, ‘আমাদের ৩ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলেটা পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় অসুস্থ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে ওর শরীরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলছে। এখন ও উঠে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারে না। মাঝে মাঝে বসে থাকার অবস্থাতেও পড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তাররা ওর এই রোগটিকে ‘ডুশিনি মাসকুলার ডিসট্রফি’ বলে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন এই রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই।’

জুলহাসের স্ত্রী সুমা বেগম (ছবি: সোনালীনিউজ)
সুমা বেগম আরও বলেন, ‘আমার স্বামী বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে শ্রদ্ধা করে বুকে ধারন করেছে। এজন্য আমিও আমার স্বামীকে সব সময় সম্মান করি। বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনার কাছে আমার ছেলেটার সু-চিকিৎসার দাবি জানাচ্ছি। আমার সন্তানটি সুস্থ্য হলে এটাই হবে আমার সবথেকে বড় পাওয়া।’

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*