যেভাবে উত্তাল সমুদ্রে ছোট্ট নৌকায় ৩৩ দিন কাটলো পিনাকীর

এক অবিশ্বাস্য সফরের গল্প। বুকে যেন কাঁপনি ধরিয়ে দেয়। আসলে গল্প নয়, দুজন যুবকের সমুদ্র তোলপাড় করা অভিযানের বাস্তব ইতিহাস এটি। কলকাতা থেকে একটা ডিঙি নৌকোয় ভেসে তারা সমুদ্র যাত্রা করেছিলেন পোর্টব্লেয়ারের পথে।
দুজনার একজন হলেন বাঙালি যুবক পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। তার সঙ্গী ভারতীয় নৌ-সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট অ্যালবার্ট জর্জ ডিউক।

কলকাতার সদানন্দ রোডের বাসিন্দা পিনাকী ছিলেন রোয়িং চ্যাম্পিয়ন। দুরন্ত সাঁতারুর পাশাপাশি ফিজিওলজির অধ্যাপক। চোখেমুখে তার দুঃসাহসিক অভিযানের স্বপ্ন। মাত্র তেইশ বছর বয়সে এক হাজার মাইল নৌকাযাত্রায় গড়ে ফেলেন বিশ্বরেকর্ড।

পালহীন একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকো। লম্বায় ২০ ফুট, চওড়ায় পাঁচ ফুট আর উচ্চতা সাড়ে চার ফুট। ঠিক যেন মধুমাঝির নৌকা। আর তাতে করেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে পাড়ি জমানো!

১৯৬৯ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি কলকাতার ম্যান অব ওয়ার জেটি থেকে যাত্রা শুরু করেন পিনাকী ও ডিউক। গন্তব্য পোর্টব্লেয়ারের আর্বেডিন জেটি। ডিঙি নৌকাটির নাম কনৌজি আংরে। নাম রেখেছিলেন বিখ্যাত সাঁতারু মিহির সেন। শিবাজির নৌ-সেনাপতি তুকোজি আংরের ছেলের নামে নৌকোর নাম। কারণ কনৌজি আংরে নাকি বহু ইংরেজ জাহাজকে ধ্বংস করেছিল। তার নামাঙ্কিত ছোট্ট নৌকাটিতে নামমাত্র সম্বল কিছু নিয়ে অভিযানে নামলেন দুই যুবক।

অভিযানের নকশা করেছিলেন ভারতীয় নৌসেনার কমান্ডার রথীন দাস। বঙ্গোপসাগরকে তিনি চিনতেন হাতের তালুর মতো।

প্রথমে কিছুদিন সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ হয় আংরে। কিছুতেই তাদের খোঁজ মেলে না। বেতার সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বায়ুসেনার বিমান বারবার তল্লাশি চালাতে লাগল বঙ্গোপসাগরের মাথায়। অবশেষে তিন দিনের দিন খবর মেলে, তারা ঠিক আছেন। এভাবে তেত্রিশ দিনের যাত্রাপথে মোট তিনবার নিখোঁজ হয়েছিলেন তারা। তাও বেশকিছু দিনের জন্যে। সেসময় ইন্দোনেশিয়ায় এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়। আর তাতে সমুদ্র উথালপাতাল। আংরে তখন কাগজের নৌকা বই অন্যকিছু না। তার মাস্তুল দুরমুশ হয়ে যায়। পাহাড় সমান ঢেউগুলো আংরে উলটেপালটে ফেলতে থাকে। অভিযানের সেসব কাহিনি পড়লে আমাদের শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রনাথের কথাও মনে পড়ে যায়। সে কাহিনিই সাহস জুগিয়েছিল পিনাকীরঞ্জনের মনে।

এই অভিযানে পিনাকীর ডান হাতের আটটা লিগামেন্ট ছেঁড়ে। বাঁহাতে দাঁড় টানতে হয়। আর সঙ্গী হয় দশ দিনের ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর। আর ডিউকের চাগাড় দিয়ে ওঠে হার্নিয়া। এইসব সত্ত্বেও হার মানেননি তারা। কম্পাস ভেঙে গেলেও তাদের মনোবল ভাঙেনি।

অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা পার হয়ে যখন গন্তব্যের কাছাকাছি তারা, রসগোল্লা খেয়ে উদযাপন করেছিলেন সাফল্যের আনন্দ। ৮ই মার্চ তারা যখন পোর্টব্লেয়ারে পৌঁছান, সেদিন সাধারণ মানুষের মনেও চরম উত্তেজনা। আর কলকাতায় ফেরার দিনটা যেন আবেগের সমুদ্রে ভেসে যাওয়া।

পিনাকীরঞ্জন ঠিক করেছিলেন, এভাবেই নৌকা করে পাড়ি দেবেন ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু তার আগেই ১৯৮৩ সালে অকাল মৃত্যু হয় তার। বয়স তখন ৪০ পেরোয়নি। আশ্চর্য এটাই, এই দুরন্ত সাঁতারুর মৃত্যু হয় জলে ডুবেই।

চুপিসারে পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেল কনৌজি আংরের অভিযান। আমাদের মনে নেই। বাঙালি জীবন থেকে রোজই খসে পড়ছে পিনাকীদের সমস্ত কীর্তিকথা। যাপনেও তার ছাপ থাকছে না কোথাও। এই রোমাঞ্চকর অভিযানের স্মৃতিও ভুলতে বসেছে বাঙালি।

সূত্রঃDailyBangladesh

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*